টেংরাটিলা বিস্ফোরণ মামলায় বাংলাদেশের পক্ষে ন্যায়বিচার: নাইকোকে ৪২ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণের নির্দেশ

Mousumi Nargis lucky | প্রকাশ: ৩০ জানুয়ারি ২০২৬, ০২:১৬
টেংরাটিলা বিস্ফোরণ মামলায় বাংলাদেশের পক্ষে ন্যায়বিচার: নাইকোকে ৪২ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণের নির্দেশ

রাজপথ ডেস্ক

গভীর ক্ষতের ওপর দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা নীরবতার অবসান হলো অবশেষে।

প্রায় দুই দশক পর আন্তর্জাতিক বিচারাঙ্গনে বাংলাদেশের দাবির পক্ষে উচ্চারিত হলো ন্যায়বিচারের রায়—টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্র বিস্ফোরণের দায়ে কানাডীয় কোম্পানি নাইকো রিসোর্সকে দিতে হচ্ছে বিপুল অঙ্কের ক্ষতিপূরণ।

সুনামগঞ্জের টেংরাটিলা গ্যাস ফিল্ডে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনায় বাংলাদেশকে ৪২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্ষতিপূরণ প্রদানের নির্দেশ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক সালিশি সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর সেটেলমেন্ট অব ইনভেস্টমেন্ট ডিসপিউটস (ইকসিড)।

পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজানুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, ইকসিড ট্রাইব্যুনালের চূড়ান্ত রায়ে এই অর্থ বাংলাদেশকে দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রের ইতিহাস দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল। ১৯৫৯ সালে সুনামগঞ্জের ছাতকে এই গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়। পরবর্তী বছর কূপ খননের মাধ্যমে ১ হাজার ৯০ মিটার থেকে ১ হাজার ৯৭৫ মিটার গভীরতায় নয়টি গ্যাস স্তরের সন্ধান পাওয়া যায়। এখান থেকে উত্তোলিত গ্যাস ছাতক সিমেন্ট ও পেপার মিলে সরবরাহ করা হতো। প্রায় ২৬ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলনের পর কূপে পানি উঠে আসায় সেটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।

দীর্ঘ সময় পরিত্যক্ত থাকার পর ২০০৩ সালে নতুন করে অনুসন্ধান ও খনন কার্যক্রমের জন্য গ্যাসক্ষেত্রটি নাইকো রিসোর্সের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

কিন্তু খননকাজ শুরুর দুই বছরের মধ্যেই ঘটে ভয়াবহ বিপর্যয়। ২০০৫ সালের ৭ জানুয়ারি এবং ২৪ জুন টেংরাটিলায় পরপর দুটি মারাত্মক বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণে গ্যাসক্ষেত্রের মজুদ গ্যাস পুড়ে যায়, ধ্বংস হয় আশপাশের স্থাপনা ও সম্পদ।

এ ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করে পেট্রোবাংলা নাইকোর কাছে ৭৪৬ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করে। তবে নাইকো সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করে।

এরপর শুরু হয় দীর্ঘ আইনি লড়াই। ২০০৭ সালে পেট্রোবাংলা স্থানীয় নিম্ন আদালতে মামলা করে এবং নাইকোর ফেনী গ্যাসক্ষেত্রের গ্যাস বিল পরিশোধ বন্ধ রাখা হয়।

হাইকোর্ট নাইকোর বাংলাদেশে থাকা সব সম্পদ বাজেয়াপ্ত এবং সম্পাদিত চুক্তি বাতিলের নির্দেশ দেন।

সুপ্রিম কোর্টেও বাংলাদেশের পক্ষেই রায় আসে। তবে আটকে রাখা গ্যাস বিল ও ক্ষতিপূরণ না দেওয়ার অভিযোগ তুলে ২০১০ সালে নাইকো ইকসিডে দুটি মামলা করে।

এর মধ্যে ২০১৪ সালের এক রায়ে পেট্রোবাংলাকে ফেনী গ্যাসক্ষেত্রের পাওনা পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়।

এর ধারাবাহিকতায় ২০১৬ সালে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স) ইকসিডে পাল্টা মামলা করে, যেখানে প্রায় ৯ হাজার ২৫০ কোটি টাকা, অর্থাৎ আনুমানিক ১১৭ কোটি মার্কিন ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করা হয়।

সেই মামলার চূড়ান্ত আদেশেই এবার এল বাংলাদেশের পক্ষে ঐতিহাসিক রায়।

ইকসিড ট্রাইব্যুনালের রায়ে বলা হয়েছে, টেংরাটিলায় খনন কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছিল নাইকোর তত্ত্বাবধান ও ব্যবস্থাপনায়।

আন্তর্জাতিক পেট্রোলিয়াম শিল্পের মানদণ্ড অনুসরণে ব্যর্থতা এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতা না নেওয়ার কারণেই বিস্ফোরণ ঘটে।

ফলে এসব ঘটনার জন্য নাইকো সরাসরি দায়ী।

দীর্ঘ আইনি সংগ্রামের শেষে এই রায় শুধু আর্থিক ক্ষতিপূরণ নয়, বরং বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদের অধিকার ও সার্বভৌম স্বার্থ রক্ষায় এক শক্ত বার্তা হয়ে রইল—অবহেলার মূল্য শেষ পর্যন্ত দিতেই হয়, তা যত দূরের আদালতেই হোক না কেন।

মন্তব্য করুন

Login to comment

আন্তর্জাতিক নিয়ে আরও পড়ুন

Global Before Footer