চট্টগ্রাম: শহর, যা নিজেই শিল্পের রঙে বোনা”

Mousumi Nargis lucky | প্রকাশ: ২৮ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:৪৪
চট্টগ্রাম: শহর, যা নিজেই শিল্পের রঙে বোনা”

রাজপথ ডেস্ক

সন্ধ্যার আলো নামছে ধীরে ধীরে। অলিয়ঁস ফ্রঁসেজের মিলনায়তনের ভেতরে তখন এক অদ্ভুত নীরব-শব্দময় উচ্ছ্বাস। দেয়ালে ঝুলছে কিছু শিল্পকর্ম, আর সেই শিল্পকর্মগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে আছেন এক মানুষ—মাথায় উলের টুপি, তার ফাঁক দিয়ে উঁকি দেওয়া সাদা চুল, পরনে কালো সোয়েটার।

----- নাম "ডানা ওয়াইজ।"

কানাডায় জন্ম, প্যারিসে বসবাস, আর পৃথিবীর নানা শহরে যাঁর ব্যঙ্গ, রসিকতা আর শিল্প একসঙ্গে মানুষকে ভাবায়, হাসায়, থামিয়ে দেয়।

চারুকলার শিক্ষার্থীরা তাঁকে ঘিরে রেখেছে। কেউ অটোগ্রাফ নিচ্ছে, কেউ ক্যাটালগে সই করাচ্ছে, কেউবা ছবি তুলছে।

হঠাৎ তিনি একটি ক্যাটালগের শেষ পাতায় নিজের হাত রেখে মার্কার দিয়ে আঁকলেন হাতের ছাপ—মুহূর্তটুকু যেন শিল্পের ভেতরেই আরেকটি শিল্প।

কিছু দূরে তাঁর বিখ্যাত ‘ক্যাপসুল সিরিজ’।

সাদা বোর্ডে পিন দিয়ে আটকানো ছোট ছোট প্লাস্টিকের ব্যাগ। ভেতরে রঙিন ক্যাপসুল। কোনো ব্যাগে লেখা—‘ফেইম ক্যাপসুল’, কোনোটি ‘লেখক হওয়ার ক্যাপসুল’, কোনোটি ‘স্বপ্ন দেখার ক্যাপসুল’।

---- যেন আধুনিক মানুষের সব আকাঙ্ক্ষা, সব হতাশা আর সব স্বপ্ন বন্দী হয়ে আছে এই ছোট্ট ওষুধের ভেতর।

ডানা ওয়াইজ বলেন, তিনি একটি আশ্চর্য ওষুধ কোম্পানির মালিক—নাম, "Jesus Had a Sister Productions।"

এই কোম্পানির ওষুধ এক ডোজেই দেয় সব সমাধান—হারানো প্রেম থেকে ঈশ্বরে বিশ্বাস পর্যন্ত।

কিন্তু এই মানুষটি এসেছেন আরও বড় এক ‘ওষুধের’ সন্ধানে—জীবনের, শহরের, মানুষের।

প্রথমবার বাংলাদেশে এসে তাঁর সফরের শুরু চট্টগ্রাম থেকে। এক সপ্তাহ কাটিয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে। গিয়েছেন মাইজভান্ডার শরিফে, শুনেছেন গান, কথা বলেছেন সুফিসাধকের সঙ্গে। ঘুরেছেন শহরের অলিগলিতে, তুলেছেন খাবার বিক্রির ভ্যানের ছবি।

হাসতে হাসতে বললেন, ‘আমি আনারসের ছবি তুলতে গিয়েছিলাম। কিন্তু ছবিতে দেখি, আনারসের সঙ্গে একই ফ্রেমে অন্তত ৩০ জন মানুষ!’

চট্টগ্রাম নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি যেন হঠাৎ আবেগী হয়ে উঠলেন। বললেন,

‘আমি প্রেমে পড়ে গেছি। এই শহরের রাস্তায় হাঁটলে মনে হয়, ইতিহাস আর বর্তমান পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। পর্তুগিজ, ইংরেজ, মোগল—সবাই এখানে রয়ে গেছে।

এত শব্দ, এত প্রাণ, এত হাসি আমি আগে কোথাও দেখিনি। গোটা চট্টগ্রামই যেন একটা জীবন্ত আর্ট গ্যালারি।’

তিনি দেখেছেন দেয়ালের লেখা, রিকশা আর সিএনজির রঙিন শরীর, মানুষের দাড়িতে মেহেদির রং, শাড়ির বৈচিত্র্য, বৈদ্যুতিক খুঁটির জট পাকানো তার। তাঁর চোখে, এগুলো কেবল বিশৃঙ্খলা নয়—এগুলো চলমান শিল্প।

ডানা ওয়াইজের শিল্প আসলে এই ভোগবাদী পৃথিবীর প্রতিই এক তীক্ষ্ণ বিদ্রূপ। বিজ্ঞাপনের ভাষা, বাজারের প্রলোভন, সাজানো জীবনের ছক—সবকিছুকেই তিনি আঘাত করেন রসিকতা আর ব্যঙ্গ দিয়ে। তবু তিনি নিজেই স্বীকার করেন, এই ব্যবস্থার বাইরে যাওয়া খুব কঠিন।

‘আমি এর বিরুদ্ধে কথা বলি, কিন্তু এই ব্যবস্থার ভেতরেই আমার শিল্প বিক্রি হয়। আমিও পুরোপুরি বের হতে পারিনি,’—বললেন তিনি।

তাঁর জীবনের গল্পটাও যেন এক শিল্পকর্ম। কানাডা থেকে প্রেমের টানে প্যারিসে পাড়ি, একবিন্দু ফরাসি না জেনে নতুন শহরে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ ভাবনা—যদি এমন কোনো ক্যাপসুল থাকত, খেলেই ফরাসি বলা যেত! সেখান থেকেই জন্ম ‘ক্যাপসুল সিরিজ’।

আর সেই খেয়ালই একদিন তাঁকে এনে দেয় ল্য মোঁদ, গার্ডিয়ান, ভ্যাঙ্কুভার সানের শিরোনামে। এমনকি ইলন মাস্কের একটি টুইট তাঁকে পৌঁছে দেয় বিশ্বজুড়ে।

চট্টগ্রাম তাঁকে দিয়েছে নতুন এক উপলব্ধি। বললেন,

‘ফরাসি শিল্পীরা জীবনের খোঁজ করে, শব্দের খোঁজ করে—অনেক সময় খুঁজে পায় না। এখানে তা এত বেশি যে মনে হয়, এই দেশের জন্য আলাদা করে কোনো শিল্পকর্মের দরকার নেই। দেশটাই পুরো একটা শিল্পকর্ম।’

বিদায়ের আগে জানালেন, বাংলাদেশ তাঁকে অনেক কিছু দিয়েছে। এই অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি কাজ করতে চান। আবার ফিরে আসতে চান।

হয়তো তখনও চট্টগ্রাম একই রকম থাকবে—শব্দে, রঙে, ভিড়ে, জীবনে—একটি শহর, যা নিঃশব্দে বলে যায়:

শিল্প শুধু গ্যালারিতে থাকে না। কোনো কোনো শহর নিজেই একটি শিল্পকর্ম।

মন্তব্য করুন

Login to comment

আন্তর্জাতিক নিয়ে আরও পড়ুন

Global Before Footer