এমডির ছায়াতলে দুর্নীতির বরপুত্র: তদন্ত শেষ না হতেই সিজনকে সিটি ব্যাংকে পুনর্বহাল
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিতর্কিত পুলিশ কর্মকর্তাদের অর্থ পাচারে সহায়তা, গাড়ির নিলামে জালিয়াতি, কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং নারী সহকর্মীকে হেনস্তাসহ নানা গুরুতর কেলেঙ্কারিতে বিতর্কিত সিটি ব্যাংকের কর্মকর্তা মোতাসিম বিল্লাহ সিজন। চাকরি হারানোর মাত্র ৯ মাসের মাথায় তাকে আবারও জাঁকজমকভাবে ব্যাংকের ‘সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট’ (SVP) পদে বসিয়ে প্রধান কার্যালয়ে ‘হেড অব স্ট্র্যাটেজিক অ্যালায়েন্স অ্যান্ড পার্টনারশিপ, রিটেইল ব্যাংকিং' এর দ্বায়িত্ব দেয়া হয়েছে।
বনানী শাখায় নারী সহকর্মীর সঙ্গে চরম দুর্ব্যবহারের যে ঘটনাকে কেন্দ্র করে তার চাকরি গিয়েছিল, সেই অভিযোগের কোনো সুরাহা বা নিস্পতি না করেই তাকে স্বপদে ফেরানো হলো। সিটি ব্যাংক সংশ্লিষ্ট সুত্র অনুযায়ী, ব্যাংকিং খাতের নিয়মকানুন তোয়াক্কা না করে তাকে পুনর্বহাল করার নেপথ্যে রয়েছেন সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও সিইও মাসরুর আরেফিন। তার প্রত্যক্ষ প্রশ্রয়েই সিজনকে চাকরিতে পুনর্বহাল করা হয়েছে বলেও জোরালো অভিযোগ উঠেছে। জানাগেছে, অভ্যন্তরীণ লুটপাট ও সিটি ব্যাংকের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় অর্থপাচারের পেছনে সিজনের প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতা থাকার বিষয়গুলো গোপন রাখতেই মাসরুর আরেফিন সিজনকে নিজের আশ্রয়ে রাখতে চান। এজন্যই পুনরায় তাকে চাকরিতে ফিরিয়ে আনেন।
বনানী শাখার শাখা ব্যবস্থাপক থাকাকালীন এক নারী সহকর্মীর ওপর চরম ক্ষিপ্ত হয়ে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন সিজন, যা ব্যাংকের পরিবেশ ও সুশাসনে চরম ধাক্কা দেয়। মানবসম্পদ বিভাগ বাধ্য হয়ে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দিলে তিনি পদত্যাগের নাটক করেন। তবে, ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদন্ত সম্পন্ন না হওয়া এবং ভুক্তভোগী সহকর্মীর ওপর অন্যায়ের কোনো সুরাহা না করেই এমডি মাসরুর আরেফীনের অদৃশ্য ইশারায় সেই ইস্তফা ঢাকা পড়ে যায়। ৯ মাসের মাথায় কোনো ধরনের বিচার বা প্রশাসনিক জবাবদিহিতা ছাড়াই তাকে উল্টো উপহার হিসেবে সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে পুনর্বহাল করা হয়েছে।
ওই নারী সহকর্মীকে হেনস্থার পরই তার বিরুদ্ধে বেশ অনিয়মের অভিযোগ উঠে আসে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সিজনের বেপরোয়া হয়ে ওঠার পেছনে মূল শক্তি ছিল বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা ও মন্ত্রীদের সঙ্গে তার গভীর সখ্যতা। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক মন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু, তাজুল ইসলাম, সাবেক আইজিপি জাবেদ পাটোয়ারী, বিতর্কিত পুলিশ কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম, ডিআইজি আব্দুল বাতেন, ডিএমপি কমিশনার শফিকুল ইসলাম, হাবিবুর রহমান এবং ডিআইজি বেলালুর রহমানসহ একাধিক প্রভাবশালী কর্মকর্তার অবৈধ অর্থ লেনদেন ও বিদেশে পাচারে প্রত্যক্ষ সহযোগী হিসেবে কাজ করতেন সিজন। তৎকালীন সরকারের প্রভাব কাজে লাগিয়ে ব্যাংকের ভেতরেও একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেন তিনি।
ছাত্রজীবনে শিবিরের রাজনীতির সাথে যুক্ত এই মোতাসিম বিল্লাহ সিজন কিভাবে আওয়ামী লীগের আমলে এমন বেপরোয়া হয়ে রাষ্ট্রের অর্থ পাচারের সহযোগী ছিলেন সেটা নিয়েও বড় প্রশ্ন থেকে যায়।
কার্ড ডিভিশনের একজন সাধারণ কর্মকর্তা থেকে রাতারাতি বিপুল সম্পদের মালিক বনে যাওয়া সিজন অতি সম্প্রতি আভিজাত্যের প্রতীক বনানী ক্লাব এবং ঢাকা বোট ক্লাব-এর সদস্যপদ গ্রহণ করেছেন। অনুসন্ধানে জানা যায়, এই দুটি আভিজাত্যপূর্ণ ক্লাবের সদস্যপদ পেতেই একজন ব্যাংক কর্মকর্তার মূল বেতনের সঙ্গে কীভাবে এত বিপুল অংকের ব্যয়ের সঙ্গতি থাকে তা নিয়ে খোদ আর্থিক খাতে সৃষ্টি হয়েছে তুমুল বিতর্ক। এছাড়া গ্রাহকের ব্যাংকে নিলাম হওয়া ৫২ লাখ টাকার টয়োটা হ্যারিয়ার গাড়ি কৌশল করে নিজে কিনে নেওয়ার মতো ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’-এর স্পষ্ট প্রমাণও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
সিটি ব্যাংকের কর্মকর্তা মোতাসিম বিল্লাহ সিজনের সাথে বহুবার দেখা করার চেষ্টা করেন দৈনিক রাজপথের নিজস্ব প্রতিবেদক না পেয়ে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি মুঠোফোনটি রিসিভ করিনি।
ব্যাংকিং খাতের বিশ্লেষকরা বলছেন, গুরুতর অপরাধ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সহকর্মী নিপীড়নে অভিযুক্ত একজন কর্মকর্তাকে কোনো সুষ্ঠু তদন্ত ছাড়াই ফেরানো ব্যাংকের কর্পোরেট গভর্নেন্সের ওপর বড় আঘাত। এমডি মাসরুর আরেফিনের একক আশ্রয়ে সিজনের এই পুনর্বহাল সিটি ব্যাংকের সাধারণ আমানতকারীদের আস্থা চরম ঝুঁকিতে ফেলছে।