৬৪ বছর বয়সে মাস্টার অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অর্জন, সিজিপিএ ৩.৮৬: অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা এ.কে.এম. মোস্তাফিজুর রহমান
নিজস্ব প্রতিবেদক,
শিক্ষা অর্জনের কোনো বয়স নেই—এই কথাটির বাস্তব উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা এ.কে.এম. মোস্তাফিজুর রহমান। আল্লাহ পাকের হুকুমে ও তাঁর রহমতে ৬৪ বছর বয়সে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় (বাউবি) থেকে মাস্টার অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (এমডিএস) ডিগ্রি অর্জন করে তিনি প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করেছেন। ৪.০০ স্কেলে ৩.৮৬ সিজিপিএ অর্জন করে ডিস্টিংশনসহ উত্তীর্ণ হওয়া তাঁর দীর্ঘ কর্মময় জীবনের এক উল্লেখযোগ্য সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী, গত ১৬ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে ঘোষিত ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের দুই বছর মেয়াদি ৬৫ ক্রেডিটের এমডিএস চূড়ান্ত পরীক্ষায় তিনি এ কৃতিত্ব অর্জন করেন। মাস্টার্সের লিখিত পরীক্ষা, গবেষণাপত্র ও ভাইভাসহ মোট ১ হাজার ৭০০ নম্বরের মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় অংশ নেন তিনি। তাঁর বাউবি রোল নম্বর ২৪২০৮৯৯৯০২২।
এ.কে.এম. মোস্তাফিজুর রহমান ঢাকার ধামরাই উপজেলার বৈষ্টবদিয়া গ্রামের, ভাড়ারিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা। তাঁর পিতা আব্দুর রহমান এবং মাতা মাহমুদা খাতুন।
গবেষণায় জলবায়ু সহনশীল জীবিকা ও সবুজ দক্ষতার ওপর গুরুত্ব
এমডিএস ডিগ্রি অর্জনের অংশ হিসেবে তাঁর গবেষণার শিরোনাম ছিল—“Building Climate-Resilient Livelihoods through Green Skills for Sustainable Development: A Case Study of Manikganj District, Bangladesh”।
গবেষণাটিতে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে সবুজ দক্ষতা বিকাশ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় মানুষের জীবিকাকে আরও সহনশীল করে তোলার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা, পরিবেশবান্ধব দক্ষতা উন্নয়ন এবং টেকসই জীবিকা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে গবেষণাটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেছে।
গবেষণার তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপেন স্কুলের ভূগোল বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. জাকিরুল ইসলাম। এমডিএস প্রোগ্রামের কোর্স কো-অর্ডিনেটর ছিলেন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপেন স্কুলের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. ইকবাল হুসাইন।
ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ একটি বহুমাত্রিক ও আন্তবিষয়ক শিক্ষাক্ষেত্র। এ বিষয়ে অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, লোকপ্রশাসন, ব্যবস্থাপনা, গবেষণা পদ্ধতি, টেকসই উন্নয়ন, এনজিও কার্যক্রম ও জননীতিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পড়ানো হয়। উন্নয়নশীল দেশগুলোর আর্থসামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে উন্নয়ন পরিকল্পনা ও নীতিনির্ধারণে দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে এ শিক্ষার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
বর্ণাঢ্য শিক্ষাজীবন ও দীর্ঘ কর্মজীবন
এ.কে.এম. মোস্তাফিজুর রহমানের শিক্ষাজীবন ছিল বৈচিত্র্যময় ও সাফল্যমণ্ডিত। তিনি তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সরকারি সা’দত বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, করটিয়া, টাঙ্গাইল থেকে ১৯৮০ সালে উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) পাস করেন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বিএসসি (গণিত) ডিগ্রি অর্জন করেন।
শিক্ষাজীবন শেষে দেশ ও মানুষের সেবার প্রত্যয় নিয়ে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে যোগ দেন তিনি। দীর্ঘ ৩৭ বছর নিষ্ঠা, সততা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। চাকরিরত অবস্থায় সরকারি অনুমোদন নিয়ে ১৯৯১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে ২০১০ সালে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কমনওয়েলথ এক্সিকিউটিভ এমবিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। ওই ডিগ্রিতে ৪.০০ স্কেলে তাঁর সিজিপিএ ছিল ৩.২৪।
দীর্ঘ কর্মজীবন শেষে ২০২২ সালের ১০ আগস্ট ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ থেকে অবসর গ্রহণ করেন তিনি। আল্লাহর রহমতে অবসরের পরও জ্ঞান অর্জনের প্রতি তাঁর আগ্রহ কমেনি; বরং নতুন করে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে তিনি নিজের অধ্যবসায়, জ্ঞানপিপাসা ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির পরিচয় দিয়েছেন।
চাকরিজীবনে সততা ও নিষ্ঠার স্বীকৃতি
বাংলাদেশ পুলিশে দীর্ঘ কর্মজীবনে সততা, নিষ্ঠা, দায়িত্বশীলতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন এ.কে.এম. মোস্তাফিজুর রহমান। কর্মক্ষেত্রে ভালো কাজ ও দায়িত্ব পালনের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ৫৬টি বিভাগীয় বিশেষ পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেন বলে জানা গেছে। পুলিশের চাকরিজীবনে তাঁর এ অর্জন দীর্ঘ কর্মজীবনে দায়িত্ব পালনের স্বীকৃতি হিসেবে উল্লেখযোগ্য।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালনকালে অর্জিত অভিজ্ঞতা ও স্বীকৃতিও তাঁর কর্মজীবনকে সমৃদ্ধ করেছে।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালন
বাংলাদেশে অর্জিত শিক্ষা, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতাকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কাজে লাগানোর পাশাপাশি বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা ও জনসেবার উদ্দেশ্যে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমেও অংশ নেন এ.কে.এম. মোস্তাফিজুর রহমান।
জাতিসংঘের সদর দপ্তর থেকে টেলিফোনে সাক্ষাৎকার এবং শান্তিরক্ষী বাহিনীতে পূর্ব অভিজ্ঞতার আলোকে নির্বাচনী প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে তিনি জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে সিভিলিয়ান পুলিশ হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পান। সাবেক যুগোস্লাভিয়ার ক্রোয়েশিয়া, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা এবং কসোভোতে তিনি দায়িত্ব পালন করেন। কসোভোতে তিনি দুইবার দায়িত্ব পালনের সুযোগ পান।
এ ছাড়া ২০০৫ ও ২০১২ সালে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তর থেকে টেলিফোনে সাক্ষাৎকারে উত্তীর্ণ হয়ে এবং শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে পূর্ব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সুদান ও দক্ষিণ সুদানে পুলিশ অ্যাডভাইজার পদে দায়িত্ব পালন করেন। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমে নিষ্ঠা ও দক্ষতার স্বাক্ষর রাখেন তিনি। কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ছয়বার জাতিসংঘের বিশেষ পদক এবং ছয়বার বিশেষ সনদ লাভ করেন বলে জানা গেছে।
নিজের কর্মজীবনে বিশ্বের ৪২টি দেশের পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন তিনি। পাশাপাশি আমেরিকা, ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়ার প্রায় ৩০টি দেশ ভ্রমণ করেছেন।
পরিবার, কৃতজ্ঞতা ও অবসরজীবনে মানবসেবা
ব্যক্তিজীবনে এ.কে.এম. মোস্তাফিজুর রহমান স্ত্রী হাসিনূর-ই-ইসলাম রুপা এবং তিন ছেলের জনক। তাঁর বড় ছেলে রহমান রা’দ শাহমাত গাজীপুরের ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি (আইইউটি) থেকে পূর্ণ বৃত্তি নিয়ে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রের শেভরন কোম্পানিতে এবং পরবর্তীতে জার্মান মালিকানাধীন সিমেন্স এনার্জিতে টারবাইন ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মরত হন।
দ্বিতীয় ছেলে রহমান শাহরুল মোয়াসাত অস্ট্রেলিয়ার ম্যাককোয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত। ছোট ছেলে রহমান সাবেরিন সামারাত ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স বিভাগে তৃতীয় বর্ষে অধ্যয়ন করছেন।
স্ত্রী হাসিনূর-ই-ইসলাম রুপার সঙ্গে পবিত্র হজ পালন করেছেন তিনি। অবসরজীবনে ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি গ্রামের অসচ্ছল মানুষ ও অসহায় পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন। বই পড়া, গান শোনা, কবিতা লেখা ও বৃক্ষরোপণ তাঁর প্রিয় শখ।
এমডিএস ডিগ্রি অর্জনের এই সাফল্যে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত শিক্ষকদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, শিক্ষকদের কাছ থেকে জ্ঞান ও শিক্ষা লাভের জন্য তিনি তাঁদের নিকট ঋণী। পাশাপাশি সহপাঠীদের সহযোগিতা এবং বিভিন্ন সময়ে তাঁর স্ত্রী হাসিনূর-ই-ইসলাম রুপা ও পুত্রদের সাহায্য ও সমর্থনের জন্য তাঁদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। এ অর্জনের পেছনে শিক্ষক, সহপাঠী ও পরিবারের সদস্যদের অবদানকে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। সবার প্রতি তিনি দোয়া ও শুভকামনা জানিয়েছেন।
তরুণ প্রজন্মের প্রতি বার্তা
নিজের দীর্ঘ শিক্ষাজীবন, কর্মজীবন ও অবসরকালীন সময়ে অর্জিত নতুন ডিগ্রির অভিজ্ঞতা থেকে তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশে এ.কে.এম. মোস্তাফিজুর রহমানের বার্তা—লেখাপড়ার কোনো বয়স নেই। আল্লাহ পাকের হুকুমে মানুষের মধ্যে প্রবল ইচ্ছাশক্তি, আগ্রহ ও অধ্যবসায় থাকলে যেকোনো বয়সেই নতুন জ্ঞান অর্জন এবং কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য পূরণ সম্ভব।
তিনি সুযোগ পেলেই সবাইকে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, শিক্ষা শুধু চাকরি বা পেশাগত উন্নতির মাধ্যম নয়; এটি ব্যক্তিগত বিকাশ, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং মানুষের কল্যাণে কাজ করারও অন্যতম ভিত্তি।
দীর্ঘ ৩৭ বছরের পুলিশি জীবন, আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালন, কর্মক্ষেত্রে বিশেষ পুরস্কার অর্জন এবং অবসরকালীন সময়ে উচ্চশিক্ষায় সাফল্য—সব মিলিয়ে এ.কে.এম. মোস্তাফিজুর রহমানের এই অর্জন অধ্যবসায়, জ্ঞানপিপাসা ও জীবনব্যাপী শিক্ষার এক অনুপ্রেরণামূলক দৃষ্টান্ত।
৬৪ বছর বয়সে মাস্টার অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অর্জনের মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছেন, বয়স কখনোই শিক্ষা ও আত্মোন্নয়নের পথে বাধা হতে পারে না।
আল্লাহর রহমতে অর্জিত এই সাফল্যের জন্য তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ, সহপাঠী, স্ত্রী ও পুত্রদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। তিনি তাঁর এ অর্জনের জন্য সবার দোয়া কামনা করেছেন এবং সকলের প্রতি দোয়া ও শুভকামনা জানিয়েছেন।